জাগ্রত দেবী দুর্গাপুরের ভিড়িঙ্গী শ্মশান কালী মন্দিরের নেপথ্য কাহিনী

দুর্গাপুর দর্পণ, দুর্গাপুর, ১৮ মে ২০২২: জানা যায়, ১২৫৯ বঙ্গাব্দে অঘ্রহায়ন মাসে অমাবস্যায় ভিড়িঙ্গী শ্মশান কালী মায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। মূর্তি স্থাপিত হয় পঞ্চমুন্ডির আসনের ওপর। টোল শিক্ষক সংস্কৃত পণ্ডিত নকড়ি রায়ের সন্তান অক্ষয় কুমার রায়। অক্ষয় কুমার ছোট থেকেই পূজা অর্চনা করতেন। শালগ্রাম শিলার সামনে নিবিষ্ট হয়ে ধ্যান করতেন। জনশ্রুতি আছে, অক্ষয়কুমার ভিড়িঙ্গী শ্মশান ভূমিতে মাতৃ আরাধনা শুরু করেন। ১৭১ বছর আগে ভয়ংকর শ্মশানভূমি। তন্ত্র প্রক্রিয়া ও সাধন ভজনের উদ্দেশ্যে ভিড়িঙ্গী গ্রামের সহজ সরল ও নিষ্ঠাবান অক্ষয় কুমার রায় তাঁর গুরুদের তুলসী দাসজি মহারাজের নির্দেশে পঞ্চমুন্ডির আসনে শক্তি স্বরূপিণী দেবী কালিকা মাতৃমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজার্চনা আরম্ভ করলেন। শ্মশানভূমি হল আরাধনার উপযুক্ত স্থান। শ্মশানে মা সর্বদা জাগ্রত থাকেন। তাই শ্মশানে মা কালীকে প্রতিষ্ঠা করাই যুক্তিসংগত মনে করেছিলেন অক্ষয় কুমার।

গুরুদেব তুলসী দাস’জির কথায় অক্ষয় কুমার ভিড়িঙ্গীর শ্মশানে যে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন, সেই মন্দিরে আজ দেশ বিদেশের নানান জায়গা থেকে মানুষ আসেন পুজো দিতে। মা তাঁদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন বলে বিশ্বাস। এখানে মা ভয়ংকর বদনা। মুক্তকেশী চতুর্ভুজা দক্ষিণাকালী নামে খ্যাত। সর্বোত্তম ও মুন্ডুমালা ভূষিতা যার বাঁপাশে নিচের হাতে সদ্য কাটা মুণ্ডু। উপরের হাতে রক্তাক্ত খড়্গ। ডান দিকের উপর ও নিচের হাতে যথাক্রমে অভয় ও বর মুদ্রা শোভা পাচ্ছে। মায়ের গায়ের বর্ণ শ্যামবর্ণ।

অগ্রহায়ণ মাসের অমাবস্যা তিথিতে প্রত্যেক বছর ভিড়িঙ্গী মায়ের বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কথিত আছে অক্ষয় কুমার দেবীমূর্তি তৈরি করেন নিজের ভাবনায়। তাঁর অভাবনীয় ভাবনার অসাধ্য সাধনের যত্ন প্রয়াসের ফল হল এই ভিড়িঙ্গী শশ্মান কালী মন্দির ও আশ্রম। প্রতিমা নির্মাণ করেছিলেন ব্রজেশ সূত্রধর ও উপেন্দ্র সূত্রধর। গ্রামের মানুষেরা অধীর হয়ে উঠলেন মায়ের দর্শনে। যেখানে গড়ে উঠল এই মন্দির সেখানে ছিল শ্মশানভূমি। দিনেরবেলা যেতেও গা ছমছম করত। সেখানেই অক্ষয় কুমার দিনরাত মায়ের আরাধনা করতেন।

পুজো প্রথম শুরু হওয়ার আগে অক্ষয় কুমার চিন্তায় পড়লেন। এই পুজোর আয়োজন কীভাবে হবে? কে বা ঢাক বাজাবে? কে বা পুজোর ফুল ফল আয়োজন করে আনবে? কিন্তু সমস্ত চিন্তার অবসান হল। দেখা গেল গ্রামবাসীরা নিজেরাই এগিয়ে এলেন। পুজোর দিনে রায় বাড়ির অপরিচিত দুই কৃষাণ খেলারাম বাদ্যকর ও শ্রীশারু বাগ্দী। তারাই ছুটো ছুটি করে মায়ের পুজোর আয়োজন করছে। গ্রামের ঢাকীর ঢাক ঢোল বাজাচ্ছে। প্রচণ্ড শীতের রাতকে উপেক্ষা করে পুজোর অনুষ্ঠানে মানুষ ভীড় করেছে মন্দির প্রাঙ্গণে।

চারিদিকে কাঁসর ঘণ্টা বাজতে লাগল । সন্ধ্যায় আরতি কাজ শেষ হল। মধ্যরাতে মায়ের মহাপুজো অনুষ্ঠিত হবে। অক্ষয় কুমার মাতৃ আরাধনার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করলেন। বেলপাতা, ফুল, লাল জবা, শ্বেতপদ্ম মায়ের পায়ে দিয়ে মায়ের পুজো করবেন। অক্ষয় কুমারের যযমানেরা নিয়ে এলেন নানান সামগ্রী। কেউ নিয়ে এলেও মিষ্টি। কেউ বা আম পল্লব, নারকেল ঘট। এছাড়াও মেয়েরা এসে মায়ের পূজার কাজকর্ম করতে লাগল। যে যাঁর সাধ্যমতো নিয়ে এসেছে ফলমূল। একসময় শীত নিবারণের জন্য ধুনি জ্বালানো হল।

অক্ষয় কুমারের গুরু তুলসী দাসজি ও অক্ষয় কুমার অধীর আগ্রহে মায়ের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। সহস্র প্রদীপের আলোয় মা আলোকিত। তাঁর মুখে দ্যুতির ছটা ছড়িয়ে পড়ছে। ধূপ প্রদীপের সৌরভে সুরভিত হয়ে আছে শ্মশানভূমি। শীতের রাতে এক সময় এল সেই মহাক্ষণ। দ্বিপ্রহরে মাতৃ পূজা আরম্ভ হল। প্রহরে প্রহরে মন্দির সংলগ্ন স্থানে যে সমস্ত শিয়াল ছিল তারা ডাকতে শুরু করেছে। শিয়ালের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে তন্ত্রমতে শুরু হল ভিরিঙ্গি মায়ের পুজো। তখন মানুষের হাতে ঘড়ি ছিল না। কিন্তু প্রকৃতিকে অনুসরণ করেই সময় নির্ধারণ করা হল।

কথিত আছে, রাত তখন দ্বিপ্রহর। গুরু শিষ্য দুজনেই নিরাবরণ দেহে পুজো শুরু করল। অক্ষয় কুমারকে মাতৃ পূজার মন্ত্র বলে দিচ্ছেন তাঁর গুরুদেব। অক্ষয়কুমার গুরুদেবকে অনুসরণ করে চলেছেন। এ ভাবেই চলছে পুজো। নির্ভুল মন্ত্র উচ্চারণে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিক্রিয়ায় ত্রুটিহীনভাবে মায়ের পুজো সম্পন্ন হল। মন্দির প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে থাকা নরনারীরা জোড় হাতে মায়ের পুজো দেখছে। অক্ষয়কুমার মাকে রক্তজবার অঞ্জলি দিচ্ছেন। মায়ের পুজোর সময় তাঁর মূর্তি যেন অপূর্ব রূপ নিয়েছে। ভক্তেরা অপলক দৃষ্টিতে সেই রূপের দিকে তাকিয়ে। ভিড়িঙ্গী শ্মশানকালী মা কমলা স্বরূপা, তিনি সুলোচনা। এভাবেই একসময় পুজো সমাপন হল। সেই থেকেই নিয়মিত অগ্রহায়ণ মাসের অমাবস্যা তিথিতে মায়ের বাৎসরিক পুজো হয়ে থাকে। সারাবছর ধরেই পুজো হয়। শিল্পাঞ্চলের মানুষ জন্মদিন হোক বা কোনও শুভ অনুষ্ঠান, শুরুর আগে এখানে পুজো দিয়ে শুভ কাজ শুরু করে থাকেন। (বিশেষ বিশেষ ভিডিও দেখতে DURGAPUR DARPAN ইউটিউব চ্যানেলটিও সাবস্ক্রাইব করুন।)

Durgapur Darpan

খবর তো আছেই। সেই সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। Durgapur Darpan আপনার নিজের মঞ্চ। যোগাযোগ- ই-মেইল- durgapurdarpan@gmail.com



error: Content is protected !!
%d bloggers like this: