গল্প- ‘গরীবের লকডাউন’ এবং ছবি

গরীবের লকডাউন

রূপসী লাহিড়ী। সপ্তম শ্রেণী। ডিআইসিভি পাবলিক হাইস্কুল। দুর্গাপুর।

মাধবপুর নামে এক ছোট্ট গ্রামে সুরেশ নামে এক গরিব লোক ছিল। সে কাজের সন্ধানে তার স্ত্রী রূপা আর বাচ্চাদের নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল। রাস্তার ধারে এক ছোট্ট ঘরে তারা থাকতো।

শহরে আসার পর সুরেশ দুবেলা-দুমুঠো খাবার জোগাড় করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করত। যে কাজ পেত সেটাই করতো এবং টাকা উপার্জন করতো। আর তাই দিয়েই তার পরিবারের আহারের ব্যবস্থা করতো। আর যেদিন তাদের কাজ জুটত না, সেদিন তাদের না খেয়ে থাকতে হতো।

ওগো…শুনছো, ঘরে তো সব চাল শেষ হয়ে গেছে। কাল ঘরে ফেরার সময় চাল, ডাল নিয়ে এসো কিন্তু।

আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো কাল কাজ খোঁজার আর টাকা পেলে সব জিনিস কিনব।

সুরেশের কথা শুনে রূপা চিন্তায় পড়ে যায়। আর পরের দিন তার বাচ্চাদের কি খাবার খাওয়াবে সেই দুশ্চিন্তায় সেদিনের রাতটা নির্ঘুমে কেটে যায়।

আর ঠিক তার পরের দিনই প্রধানমন্ত্রী মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো দেশ লকডাউন ঘোষণা করেন। তারা কোনও ভাবেই ঘর থেকে বাইরে যেতে পারবে না আর কোনও দোকানপাট খোলা থাকবে না।

পরের দিন সকাল হতে সুরেশ তৈরি হয়ে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে গেল। সকাল গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। আর এদিকে সে কোথাও কোনও কাজ পেল না। একটা দোকানও খোলা নেই।

…হে প্রভু, আজ তো কোনও কাজই পাচ্ছিনা। ঘরে খাবার মত দুমুঠো চাল নেই। বাচ্চাগুলো না খেয়ে আছে। কি যে করি…

এ কথা ভাবতে ভাবতে সুরেশ হতাশ হয়ে তার পথ চলতে লাগল। মাঝরাস্তায় হঠাৎই এক পুলিশ তাকে মারতে শুরু করে…

ওরে বাবা…মাগো…কে মারে…কে মারে…আহ…আহ…লাগে…লাগে…

পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করে কেন সেখানে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে…

পুলিশের কথা শুনে গরিব লোকটি বলে…কেন স্যার, কেন মারেন আমায়…..পুলিশ তাকে লকডাউনের কথা বুঝিয়ে বলে। সুরেশ জিজ্ঞেস করে, তাহলে এই গরীব মানুষদের কি হবে তারা কি না খেতে পেয়ে মারা যাবে?

না না…তা কেন? রেশন ব্যবস্থা চালু আছে। ফ্রিতে চাল, ডাল পাওয়া যাবে!

বাড়ি ফিরে তার বউকে সব কথা জানালো সুরেশ। তার বাচ্চারা কাঁদতেই থাকে, কাঁদতেই থাকে খিদের জ্বালায়…সুরেশ বাচ্চাদের সেদিন জল খাইয়ে রেখে দেয়।

পরদিন সুরেশ আবার বের হয়। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে এক দোকানে রেশন দিতে দেখে লাইনে দাঁড়ায় কিন্তু যখন তার পালা আসে তখন রেশন দোকানের মালিক তাকে কার্ড দিতে বলে। সুরেশ জানায়, তার কাছে কোনও কার্ড নেই। দোকান মালিক বলে, তাহলে সে রেশন পাবে না। সেখান থেকে সুরেশকে প্রায় তাড়িয়েই দিল সে।

সুরেশ কাঁদতে কাঁদতে এক দোকানের সামনে ভিড় দেখে দাঁড়ায়। সেখানে গরিব-দুঃখীদের খাবার বিলি করা হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ লাইন। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার শেষ। সে কাঁদতে কাঁদতে পথ চলতে থাকে…ডাস্টবিন দেখে কিছু বাসি খাবার তুলে নিয়ে গিয়ে সে তার বাচ্চাদের খাওয়ায়।

পর দিন সকাল হতেই সুরেশ আবার রাস্তায় বেরোয়। ভিড় দেখে ওষুধের দোকানের একটি লোককে জিজ্ঞেস করে ভিড়ের কারণ। লোকটি বলে, সবাই করোনা থেকে বাঁচতে মাস্ক কিনতে এসেছে। কিন্তু দাদা আমার তো পয়সা নেই! লোকটি তাকে একটি মাস্ক দেয়।

সুরেশ মাস্ক নিয়ে সোজা বাড়ি গেল। স্ত্রীকে সেটা দেখিয়ে বলল, কাপড় দিয়ে এমন মাস্ক বানিয়ে তারা বিক্রি করবে। পরের দিন মাস্ক নিয়ে রাস্তায় যেতেই বিক্রি শুরু হয়। তা দেখে ওষুধের দোকানের মালিক সুরেশের কাছ থেকে সব মাস্ক কিনে নেয়। বাড়ি ফিরে ফের মাস্ক বানিয়ে পরদিন আবার দোকানে সেগুলি বিক্রি করে সুরেশ। শেষ পর্যন্ত এভাবেই তাদের সুদিন ফেরে।

তাই বলি বন্ধুরা, তোমাদের আশপাশের গরিব লোকদের সাহায্য করো। তাহলে এটাই হবে সত্যিকারের মনুষত্ব। ধনী বা মধ্যবিত্তরা কোনও না কোনওভাবে চালিয়ে নিতে পারে কিন্তু এরা তো পারবে না…

ছোটদের আঁকা ছবি

ছবিটি এঁকেছে আরাধ্যা মন্ডল। কেজি-২। ইছাপুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠ।

 

Durgapur Darpan

খবর তো আছেই। সেই সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। Durgapur Darpan আপনার নিজের মঞ্চ। যোগাযোগ- ই-মেইল- durgapurdarpan@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.