এবং বিজয়া…

(এখানে ক্লিক করে আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটিও সাবস্ক্রাইব করুন নিয়মিত আপডেট পেতে)

‘এবং বিজয়া’… লিখছেন মানু গৌতম
মানুষের লোকাচার বিশ্বাস এবং বিজয়া নিয়ে কিছু কথা বলতে চলেছি। এই সব কাজ স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে আলাদা হতে পারে। কারণ এখানে দেশাচার, লোকাচার ও স্থানীয় বিশ্বাস কাজ করে। আমার দীর্ঘ ২৭ বছরের পৌরহিত্য জীবনে কাছ থেকে যা দেখেছি যা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি সেটাই বলবার চেষ্টা করছি। এখানে সর্বজনীন পুজোর কথা বলছি না। বলছি একান্ত পারিবারিক পুজোর কথা।

দশমীর দিন ঠাকুর তলায় তেমন ভিড় হয় না। কেবল মহিলাদের আনাগোণা বৃদ্ধি পায়। কারণ তখন যেটা তাঁরা করবেনই, তা হল ‘যাত্রা’। এখানে যাত্রা মানে to act or journey নয়। এর অর্থ হল, a point of time when journey can be starting অর্থাৎ এও যেন বৎসরের শুরু, এ যেন শারদ বর্ষ, বাংলা বৎসর যেমন হাল খাতা দিয়ে শুরু হয় তেমনই এই শারদ বৎসর যাত্রার মাধ্যমে শুরু হয়। এখানে ঠিক বিসর্জনের আগে মহিলারা একটা কৌটায় একটা কয়েন বা মূদ্রা নিয়ে এসে ঠাকুরের সামনে দেন। এই কৌটাও কিছুটা আভিজাত্য বহন করে। সাধ ও সাধ্য অনুযায়ী কারওর রূপার কৌটা, কারওর অন্য কোনও ধাতুর, কারওর কাঠের হয়। কয়েনটাও তাই। কারওর রূপার কয়েন, তাতে সোনা ঠেকানো, কারওর শুধুই প্রচলিত এক টাকার কয়েন, কারওর প্রাচীন তামার কয়েন।

তারপর পুরোহিত মহাশয় সেই কয়েনে ঠাকুরের সিঁদুর ঠেকিয়ে সেটা মায়ের ঘট ও চরণ স্পর্শ করিয়ে সাথে একটু ফুল দিয়ে আবার কৌটায় ভরে দেন, সাধারণত কোনও মন্ত্র বলেন না আবার কেউ কেউ ‘ওঁ পূর্ণ মদঃ পূর্ণ মিদং পূর্ণাৎ পূর্ণ মুদচ্যতে, পূর্ণস্য পূর্ণ মাদায় পূর্ণ মেবা বশিষ্যতে’, এই মন্ত্র দ্বারা সম্প্রদান করেন। তার পর সেই কৌটা পরম যত্নে মহিলারা নিত্যপুজোর আটং-এ (ছোট সিংহাসন) রেখে প্রত্যহ পুজো করেন। এতে না কি সব দুর্ভাগ্য কেটে গিয়ে সংসারের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে।

এর পর এক দলকে দেখি বসে থাকতে ঘটের পুষ্প সংগ্রহ করতে। এটি সংগ্রহ করে কেউ লাল শালুতে (কাপড় বিশেষ) বেঁধে দরজায় ঝুলিয়ে রাখেন। যাতে যখনই কাজে বাইরে বের হবেন তখন মনে থাকুক আর নাই থাকুক তা যেন মাথায় ঠেকে, অর্থাৎ দুর্গাকে যেহেতু দুর্গতিনাশিনী বলা হয় তাই তাঁর আশিস নিয়ে বের হতে হবে। আবার, একদল আসেন তাঁদের সন্তানের সুরক্ষার জন্য মঙ্গল সূত্র সংগ্রহ করতে। যাতে সন্তানের জীবনে অমঙ্গল স্পর্শ না করে। তার পর যখন নবপত্রিকা ভাসাতে ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় তখন সেখানেও দেখি শুভ কিছু খুঁজে নেওয়ার জন্য মানুষ হাজির। যেমন, দেখি নব পত্রিকার হরিদ্রা সংগ্রহ করতে আসেন, সে হলুদের টুকরো নিয়ে তাকে একটু একটু করে পরিবারের সকলকে খাওয়ান। এতে নাকি দুর্গার কৃপালাভ হয় ফলে শরীর সুস্থ ও সবল থাকে। এমন কি সেই হরিদ্রা গাছটি জল থেকে তুলে নিয়ে কেউ কেউ বাড়িতেও বসান যাতে আরও হলুদের যোগান পাওয়া যায়।এক দল আসেন কলা গাছটি সংগ্রহ করতে। এই কলা গাছ নিরোগ হয় ও ফলনও ভালো হয়। এই ভাবে বিজয়াকে ঘিরে একটা পারিবারিক শুভ ফল খুঁজে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।

তবে সব থেকে আকর্ষণীয় যে কাজটি আপামর জনতা করেন, সেটা হল এক জন অন্তজ নারী একটি বা দুটি পুঁটি মাছ সকালে বাড়িতে দিয়ে যান। তার পরিবর্তে কিছুটা চালভাজা, মুড়ি-মুড়কি, মিষ্টি দাবি করেন। কখনও কাপড়ও দেন কেউ কেউ। তারপর গৃহস্থের বৌ সেই পুঁটি মাছ সিঁদুর ও হলুদ মাখিয়ে চালের বাতায় অর্থাৎ চালের নিচে গুঁজে রেখে দেন। যাঁদের দালান বাড়ি, তাঁরা সামনে যেখানে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় চোখে পড়ে তেমন জায়গায় রাখেন। অর্থাৎ, যাত্রা শুভ হবে। সিঁদুর মাখা পুঁটি মাছ দেখে তবেই বাড়ি থেকে বের হতে হয় যাতে যাত্রাটা শুভ হয় এবং শুভ ফল পাওয়া যায়। এটাই বাংলার সংষ্কৃতি, এটাই ঁবিজয়া ঘিরে বাঙালির বিশ্বাস। (ছবি সৌজন্য: বুবাই গোস্বামী) (বিষয় বা মতামত একেবারেই লেখকের ব্যক্তিগত। তার দায় দুর্গাপুর দর্পণ কর্তৃপক্ষের নয়।)



Durgapur Darpan

খবর তো আছেই। সেই সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। Durgapur Darpan আপনার নিজের মঞ্চ। যোগাযোগ- ই-মেইল- durgapurdarpan@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: