
দুর্গাপুর দর্পণ, দুর্গাপুর: ক্লাসরুমের চার দেওয়ালের বাইরে বেরিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজছে পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের ড. বি. সি. রায় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (BCREC) তরুণ ‘ইঞ্জিনিয়ার’রা। কেউ ভাবছেন, আগুনের কাছে কী ভাবে পৌঁছে যাবে AI ড্রোন, কেউ আবার ভবনের নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রযুক্তি তৈরি করছে। কারও লক্ষ্য, শিল্পক্ষেত্রে মানুষের কাজকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করে তোলা।
BCREC এর Institution’s Innovation Council (IIC 8.0)-এর উদ্যোগে আয়োজিত দু’দিনের Mentoring: Demo Day/ Exhibition/Poster Presentation and Demonstration of Start-Ups & Linkage with Mentors/Experts শীর্ষক কর্মশালায় উঠে এল এমনই একাধিক উদ্ভাবনী ভাবনা। ECE বিভাগের Advanced Prototype Lab-এ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে পড়ুয়ারা নিজেদের তৈরি প্রোটোটাইপ, ইঞ্জিনিয়ারিং সিমুলেশন এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের সামনে তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পড়ুয়াদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা ও উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করা। শুধু নতুন কিছু ভাবা নয়, সেই ভাবনাকে কার্যকর প্রোটোটাইপে পরিণত করে বাস্তব সমস্যার সমাধানে কতটা ব্যবহার করা সম্ভব—তার বাস্তবায়ন দেখে নেওয়া ছিল এই আয়োজনের উদ্দেশ্য। আগুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘বুদ্ধিমান’ ড্রোন তৈরি করে প্রথম স্থান দখল করে অধ্যাপক ড. তাপস মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে অবেশ সাহা, রিক্তা মাজি, দীপশিখা চেল ও লিজা সামন্ত।
তাঁদের এই AI-চালিত ‘Surveillance and Fire Intervention & Rapid Extinguishing Borne Intelligent Response Drone’ এর লক্ষ্য, অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে আকাশপথে দ্রুত নজরদারি ও আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা। শিল্পাঞ্চল কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে যেখানে দ্রুত দমকলের ইঞ্জিন পৌঁছনো কঠিন, সেখানে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানেও চমক ছিল। দ্বিতীয় স্থান পায় অধ্যাপক ড. অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অধ্যাপক ড. অনুপ কুমার দাসের তত্ত্বাবধানে নম্রতা রায়, রাজদীপ দে, ঋষভ কুমার ও সৌম্য সিংয়ের ‘PULSE: Active Stress-Wave Interrogation for Structural Health Monitoring’ প্রকল্প। ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের ভাবনাকে কেন্দ্র করে তৈরি এই প্রকল্প বিচারকদের নজর কাড়ে।
তৃতীয় হয়েছে অধ্যাপক ড. অভিজিৎ ব্যানার্জি ও অধ্যাপক ড. ত্রিবেণীপ্রসাদ ব্যানার্জির তত্ত্বাবধানে অনিকেত মণ্ডল, শ্রেষ্ঠা দাস ও প্রিয়াংশু সিংয়ের ‘Design and Development of Uday Bot: A 6-DOF Articulated Robotic Arm for Industrial Pick and Place Automation’। শিল্পক্ষেত্রে Pick and Place Automation-এর জন্য তৈরি 6-DOF articulated robotic arm-এর নকশা ও উন্নয়ন ছিল এই প্রকল্পের মূল বিষয়।
শুধু পুরস্কারের জন্য নয়, বাস্তব ক্ষেত্রে নিজেদের উদ্ভাবন কতটা কাজে লাগতে পারে, সেই দিকটিও তুলে ধরেন পড়ুয়ারা। AICTE IDEA Lab এবং CDAC Lab-এর প্রোটোটাইপিং সুবিধা ব্যবহার করে তৈরি করা বিভিন্ন মডেল, সিমুলেশন এবং pitch deck অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়।
আরও পড়ুন: সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল নজির গড়ল বিসিআরইসি
অনুষ্ঠানে অতিথি বিচারক ও মেন্টর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন The Supreme Industries Limited-এর AVP প্রমোদ কুমার সোয়েন। তিনি পড়ুয়াদের প্রোটোটাইপের কার্যকারিতা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি কীভাবে একটি উদ্ভাবনী ভাবনাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গিয়ে বাজারযোগ্য উদ্যোগে পরিণত করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানটির সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন ECE বিভাগের অধ্যাপক ড. তাপস মণ্ডল, অধ্যাপক ড. অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় ও অধ্যাপক শুভদ্রা দেব রায়। উপস্থিত ছিলেন BCREC-এর অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সঞ্জয় এস. পাওয়ার, উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কে. এম. হোসেন, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মী ও পড়ুয়ারা। মেন্টরিং সেশন ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দু’দিনের এই আয়োজন।
তবে পুরস্কারের মঞ্চ পেরিয়ে এই আয়োজনের আসল সাফল্য অন্য জায়গায়—পড়ুয়ারা যে শুধু পরীক্ষার উত্তর লিখছে না, বরং নিজেদের ভাবনা দিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছে, তারই ছবি উঠে এল BCREC-এর এই উদ্ভাবনী মঞ্চে।

