দুর্গাপুর দর্পণ, দুর্গাপুর: সকালে গিয়ে সারাদিন হৈ হুল্লোড় করে কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা, এমন নানা আকর্ষণীয় পর্যটন স্থল রয়েছে পশ্চিম বর্ধমান (Paschim Bardhaman) জেলায়। শীতে এই সব জায়গায় জেলা, রাজ্য তো বটেই, পার্শ্ববর্তী ঝাড়খন্ড রাজ্য থেকেও অনেকে আসেন পিকনিক করতে।
মাইথন:শীত পড়লেই মাইথনে পিকনিক পার্টির ভিড় জমতে শুরু করে। বিশেষ করে বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষ ছাড়াও শনি ও রবিবার বহু পর্যটক এখানে আসেন। মাইথন বাঁধটি ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমানায়। এটি ১৫৭১২ ফুট (৪৭৮৯ মিটার) দীর্ঘ এবং ১৬৫ ফুট (৫০ মিটার) উঁচু। এই বাঁধটি বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এখানে একটি ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে যা পুরো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে প্রথম। বাঁধটি বরাকর নদীর উপর নির্মিত।৬৫ বর্গ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বিস্তৃতযার অধিকাংশটাই পার্শ্ববর্তী ঝাড়খন্ড রাজ্যের মধ্যে পড়ে।জলাধারের পরিধি ১৬০ বর্গমিটার।নদীর তলদেশ থেকে জলাধারের উচ্চতা ৫০০ ফুট।প্রায় ৮০০ মিটার এলাকার ওপর নির্মিত হয়েছে কংক্রিটের বাঁধ।১১ টি লক গেট আছে।জল যখন নদীর বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন এই লকগেট খুলে বাঁধের জল ছাড়া হয়।এই বাঁধের পাশে এক পাহাড়ের কোলে বানানো হয়েছে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি।
পর্যটকদের বরাবরের প্রিয় পাহাড়, জল, জঙ্গল ঘেরা মাইথন। শহুরে কোলাহল, শিল্পাঞ্চলের ধুলো কালি ধোঁয়া এখানে ম্যাজিকের মত উবে গেছে।নীল জলরাশি, জঙ্গল আর পাহাড়ের এক অপরূপ মেলবন্ধন।আসানসোল অথবা বরাকর স্টেশনে নেমে ২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে ভাড়া গাড়িতে মিনিট ত্রিশের মধ্যে মাইথন।কোথাও নীলজলরাশি আলতো করে পাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও বা ঢেউ আছড়ে পড়ছে। বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে নেমে ড্যামের পাড়ে চলে আসা যায়।গভীর জলের মাঝে দূরে দূরে জলাধারের মাঝে জেগে রয়েছে কয়েকটি টুকরো টুকরো দ্বীপ।ঘাটে অনেকগুলো নৌকা বাঁধা। এখানকার মুখ্য আকর্ষণ নৌকাবিহার। নৌকায় চড়ে যাওয়া যায় চামচ দ্বীপ, আনন্দ দ্বীপ ও সবুজ দ্বীপে।
(BCREC & Group of institutions । পূর্ব ভারতের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। 933927844, 9832131164, 9932245570, 9434250472)
গড় জঙ্গল: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এই জঙ্গলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ভাগবত ও পুরাণ অনুযায়ী মহামুনি মেধাসের নির্দেশে সত্যযুগে রাজা সুরাট গড় জঙ্গলের ভিতরে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। রাজা সুরাটের তৈরি মন্দিরে আধুনিক যুগে ফের পুজো শুরু করেন যোগীরাজ গিরি। রয়েছে টেরাকোটা সমৃদ্ধ প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো মন্দির। এখানে অতীতে ১৬টি মন্দির ছিল। এখন আছে মাত্র দুটি, শ্যামারূপা মন্দির এবং একটি শিব মন্দির। বন দফতরের উদ্যোগে প্রায় ১০কিমি ট্রেকিং রুট তৈরি করা হয়েছে এই জঙ্গলে। এই জঙ্গলের শেষ প্রান্তে রয়েছে ইছাই ঘোষের দেউল।
দুর্গাপুর থেকে কিলোমিটার বিশেক দূরে অবস্থিত গড় জঙ্গল পরিচিত মেধাশ্রম বা শ্যমারুপা মন্দির নামেও। একাদশ শতাব্দীতে বাংলার রাঢ় অঞ্চলের অধিবাসী শবর উপজাতির রাজা সুরথ মহর্ষি মেধাসের পরামর্শে এখানে প্রথম অনুষ্ঠিত করেন দুর্গা পুজো। এখনও এখানে রয়েছে রাজা সুরথের পুজার বেদী। আশ্রমের সাইনবোর্ডে উল্লেখিত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে জানা যায়, চন্ডীমঙ্গল এও নাকি একই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। মূল মন্দিরটি কালের প্রকোপে বিলুপ্ত হয়েছে অনেকদিনই। এখনকার মন্দিরটি বর্ধমানের রাজপরিবারের তৈরী। রয়েছে একটি শতাব্দী প্রাচীন তেতুল গাছ। দুর্গাপুর-মলান দিঘি-জয়দেব কেন্দুলীর রাস্তা ধরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ১৫ যাওয়ার পর ডানদিকে লাল মাটির কাঁচা রাস্তা। শেষ পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা গিয়েছে ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে।
(Dvita Eye Care। কলকাতার বাইরে সেরা চোখের হাসপাতাল। যোগাযোগ- 0343-6661111)
ইছাই ঘোষের দেউল: ইছাই ঘোষ শুধু ধর্মমঙ্গল কাব্যের নায়ক ছিলেন তাই নয়, একাদশ শতকের ইতিহাসে তাঁর অবদানের উল্লেখ আছে। বাংলায় তখন পাল রাজা মহীপালের রাজত্ব। ইছাই ঘোষ তখন এক জন স্বাধীন সামন্ত রাজা। তিনিই ছিলেন এই এলাকার গড়ের অধিপতি। এই গড় জঙ্গলেই নাকি তাঁর দুর্ভেদ্য ঘাটি ছিল। জনশ্রুতি, তাঁরই প্রতিষ্ঠিত শিখর ধারার দেউলটি ‘ইছাই দেউল’ নামে পরিচিত।
কলকাতা থেকে ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে পানাগড়। তার পর ‘দার্জিলিং মোড়’ থেকে ডান দিকে ঘুরে সোজা ইলামবাজারের পথে। ইলামবাজার আসার অনেক আগেই বাঁ দিকে ঢুকে গিয়েছে পিচ রাস্তা। সেই রাস্তাই নিয়ে যাবে অজয় নদের পাড়ে ‘ইছাই ঘোষের দেউল’-এ। আবার দুর্গাপুর স্টেশন থেকে বাসে মুচিপাড়া গিয়ে সেখান থেকে ট্রেকারে করে সোজা দেউলে যাওয়া যায়।
(The Mission Hospital. দেশের সেরা চতুর্থ হাসপাতাল এখন দুর্গাপুরে। যোগাযোগ- 8687500500)
এই মন্দিরের বয়স নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন দেউলটি ষোলোশো, সতেরোশো শতকের। তার চেয়ে প্রাচীন নয়। দেউল ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটনস্থল। দেউলটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ দ্বারা সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। এলাকা জুড়ে রয়েছে গহন জঙ্গল। পাশেই অজয় নদ। পুরো এলাকাটা ছোট টিলার মতো। জঙ্গলের মাথায় দেউলের চূড়াটি দেখা যায়। দেউল পার্কে থাকার জন্য কটেজ এবং গেস্ট হাউস আছে। প্রায় ২০০ বিঘা জমির উপরে জেলা পরিষদ তৈরি করেছে পার্ক। পাশেই বনবিভাগের ডিয়ার পার্ক। সেখানে হরিণ এবং ময়ূর ঘুরে বেড়ায়। শীতকালে পিকনিক পার্টির ভিড় লেগেই থাকে এখানে। তাছাড়া বছরের অন্যান্য সময়েও অনেকে ভিড় জমান এখানে। (বিশেষ বিশেষ ভিডিও দেখতে DURGAPUR DARPAN ইউটিউব চ্যানেলটিও সাবস্ক্রাইব করুন)


