দুর্গাপুর দর্পণ, দুর্গাপুর, ৪ অক্টোবর: প্রথম দেখায় চোখে ধাঁধা লাগবে! মাটির প্রতিমা ভেবে কাছে গেলেই চমক—এ তো মাটি নয়, কাগজে গড়া মা দুর্গা! আর্ট পেপার, বাঁশ, রং, আঠা আর সামান্য চুমকির কারুকাজে তৈরি এই প্রতিমার ওজন মাত্র ২২ কেজি। হালকা বলে বহনে সহজ, অথচ রূপে-সৌন্দর্যে কোনও খামতি নেই। শিল্পীর দাবি, অগ্নি নির্বাপক উপকরণ মেশানো থাকায় সহজে আগুনও ধরে না। পরিবেশবান্ধব এই অভিনব কাগজের দুর্গাই এবার দুর্গাপুরের একটি বড় শপিংমলে নজর কাড়ছে সকলের।
এই অভিনব সৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছেন দুর্গাপুরের বেনাচিতির শিল্পী বাপি বিশ্বাস এবং তাঁর পরিবার। ১৯৯২ সালে শুরু হয়েছিল তাঁদের প্রতিমা তৈরির পথচলা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিমা নির্মাণই তাঁদের পরিবারের পেশা, নেশা এবং ভালোবাসা। তবে মাটির প্রতিমার পাশাপাশি কাগজকে শিল্পের উপকরণ করে তোলার ভাবনাই তাঁদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
স্টুডিও নয়, বাড়ির উঠোনেই চলে তাঁদের শিল্পচর্চা। প্রায় তিন মাস ধরে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে মিলে ধাপে ধাপে তৈরি করেন একটি কাগজের দুর্গাপ্রতিমা। কাগজের প্রতিটি স্তর, বাঁশের কাঠামো, রং, আঠা এবং অলঙ্করণের নিখুঁত সমন্বয়ে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে দেবীর রূপ। শেষ পর্যায়ে রং-তুলির আঁচড়ে প্রতিমার চোখ-মুখে প্রাণ এনে দেন শিল্পী।
বাপি বিশ্বাসের কথায়, মাটির প্রতিমা তৈরির প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে এমন একটি প্রতিমা তৈরির চেষ্টা থেকেই কাগজের দুর্গার ভাবনা। তাঁর দাবি, কাগজের প্রতিমার খরচ তুলনামূলক কম, ওজন অনেকটাই কম এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়াও সহজ। একই সঙ্গে পরিবেশের উপর চাপ কমানোর দিকটিও তাঁদের ভাবনায় রয়েছে।
শুধু দুর্গাপুরেই নয়, এই অভিনব প্রতিমার চাহিদা পৌঁছে গিয়েছে ভিনরাজ্যেও। গত বছর বাপি বিশ্বাসের হাতে তৈরি প্রতিমা পাড়ি দিয়েছে হরিয়ানা, নয়ডা, দিল্লি-সহ বিভিন্ন জায়গায়। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যেও এই ধরনের হালকা ওজনের প্রতিমা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জানান শিল্পী।
এবার মাত্র ২২ কেজি ওজনের কাগজের দুর্গা স্থান পেয়েছে দুর্গাপুরের একটি বড় শপিংমলে। ফলে সাধারণ দর্শকদের কাছেও নতুন করে সামনে এসেছে এই অভিনব শিল্পকর্ম। প্রথম দেখায় অনেকেই বুঝতেই পারছেন না—যে প্রতিমাকে এতটা ভারী ও মজবুত মনে হচ্ছে, তার মূল উপকরণ আসলে কাগজ।
তিন মাসের শ্রম, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সহযোগিতা আর কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি প্রতিমা। তাই বাপি বিশ্বাসের কাছে এই কাগজের দুর্গা শুধু পুজোর প্রতিমা নয়, বরং তাঁর পরিবারের দীর্ঘ শিল্পসাধনারও প্রতিচ্ছবি।
মাটি ছেড়ে কাগজে দেবীর রূপ দেওয়ার এই শিল্পকৌশল তাই একই সঙ্গে অভিনব, হালকা এবং পরিবেশবান্ধব ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। বেনাচিতির এক শিল্পীর হাত ধরে কাগজের পাতায় ফুটে উঠছে সেই চিরচেনা মা দুর্গা।
(বিশেষ বিশেষ খবরের ভিডিয়ো দেখতে Durgapur Darpan Youtube Channel সাবস্ক্রাইব করুন)


