সব কেমোথেরাপিতে চুল পড়ে না। আবার কেমোথেরাপিতে সমস্ত চুল ঝরে গেলেও তা যে আর গজাবে না, এমন ধারণাও ঠিক নয়। চিকিৎসার পরে ফের চুল গজানোর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতার বার্তা দিলেন পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের মিশন হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ও রোবোটিক সার্জেন ডা. অর্ণব চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যানসার ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই স্তন সংরক্ষণ করে চিকিৎসা সম্ভব। প্রয়োজন হলে পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেও ফিরিয়ে আনা যায় স্তনের স্বাভাবিক আকৃতি।
দুর্গাপুর দর্পণ, দুর্গাপুর, ১৩ অক্টোবর: স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে রোগীদের নানা আশঙ্কা থাকে। তার মধ্যে অন্যতম চুল ঝরে পড়া। চুলের পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক চেহারাতেই প্রভাব ফেলে না, অনেকের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও তার প্রভাব পড়ে। তবে কেমোথেরাপি মানেই যে সব চুল উঠে যাবে, তা নয়। কোন ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার মাত্রা এবং চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী চুল পড়ার মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
ডা. অর্ণব চক্রবর্তীর বক্তব্য, কেমোথেরাপিতে চুল পড়ে গেলেও তা স্থায়ী হবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। নিজের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, বছরখানেক আগে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ৫০ বছর বয়সি এক মহিলার কেমোথেরাপির পরে মাথার সমস্ত চুল ঝরে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর মাথায় ফের চুল গজাতে শুরু করে। চিকিৎসকের দাবি, কেমোথেরাপি শেষ হওয়ার প্রায় তিন মাস পর থেকেই নতুন চুল গজাতে শুরু করেছিল ওই মহিলার। পরে তাঁর চুল আগের তুলনায় আরও ঘন হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অবশ্য কেমোথেরাপির পরে চুল ফের গজানোর সময়সীমা এবং চুলের ঘনত্ব প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ ও ব্যক্তির শারীরিক পরিস্থিতির উপর তা নির্ভর করে। তাই চিকিৎসা চলাকালীন চুল পড়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই জরুরি।
স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েও আশার কথা শুনিয়েছেন ডা. চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্য, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই স্তন সম্পূর্ণ বাদ না দিয়েও অস্ত্রোপচার করা সম্ভব। রোগের পর্যায়, টিউমারের অবস্থান এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা স্তন সংরক্ষণকারী অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি উপযুক্ত নয়।
কোনও কারণে স্তন বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্তনের আকৃতি ফিরিয়ে আনার সুযোগও রয়েছে। প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের সাহায্যে রোগীর শারীরিক গঠন এবং চিকিৎসাগত পরিস্থিতি অনুযায়ী এই ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
চিকিৎসকের বক্তব্যে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা মানেই শুধু রোগের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, চিকিৎসার পরে জীবনযাত্রা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চুল ঝরে পড়া কিংবা স্তনের আকৃতিতে পরিবর্তনের মতো অভিজ্ঞতা রোগীর মনে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। সেই সময়ে পরিবারের সমর্থন, মানসিক যত্ন এবং চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা বিশেষ প্রয়োজন।
স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল, রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা এবং দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। উপযুক্ত সময়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার একাধিক সম্ভাবনা খোলা থাকে। চুল ঝরে পড়া বা শরীরের পরিবর্তনকে ঘিরে ভয় নয়, বরং সঠিক তথ্য, চিকিৎসা ও মানসিক সমর্থনই হতে পারে রোগীর ঘুরে দাঁড়ানোর মূল অবলম্বন।
আরও পড়ুন- উন্নত প্রযুক্তিতে দুই হাঁটু প্রতিস্থাপন, মাত্র ১০ দিনেই স্বাধীনভাবে হাঁটলেন ৬৫ বছরের রোগী!


