
দুর্গাপুর দর্পণ, দুর্গাপুর: আট বছর আগে একটি ট্রলি ব্যাগ থেকে উদ্ধার হয়েছিল এক তরুণীর পচনধরা দেহ। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য আজও ভুলতে পারেননি পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের মানুষ। দীর্ঘ তদন্ত এবং বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ের শেষে অবশেষে বহুচর্চিত সেই খুনের মামলায় ব্যাঙ্ক ম্যানেজার রাজীব কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিল দুর্গাপুর আদালত।
কিন্তু আদালতের রায় প্রকাশের পরও বাঁকুড়ার মেজিয়ার মৃত তরুণী শিল্পা আগরওয়ালের পরিবারের মনে রয়ে গেল শূন্যতা। তাঁদের দাবি, এই অপরাধের একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত ছিল মৃত্যুদণ্ড। আট বছরের দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার শেষে আদালতের রায় এসেছে ঠিকই। কিন্তু শিল্পার পরিবারের বক্তব্য, “রায় হয়েছে, কিন্তু আমাদের ক্ষতি কোনওদিন পূরণ হওয়ার নয়।”
২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দুর্গাপুরের বেনাচিতির রূপালি অ্যাপার্টমেন্টের লিফ্টের পাশের ছোট ঘর থেকে একটি বড় ট্রলি ব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ। ব্যাগ খুলতেই সামনে আসে শিল্পার পচনধরা দেহ। ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে গোটা শিল্পাঞ্চলে।
তদন্তে জানা যায়, মেজিয়ার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ম্যানেজার ছিলেন রাজীব কুমার। একই ব্যাঙ্কে ‘ব্যাঙ্ক মিত্র’ হিসেবে কাজ করতেন শিল্পা। শিল্পার দাদা সন্দীপ আগরওয়ালের অভিযোগের ভিত্তিতে রাজীব ও তাঁর স্ত্রী মনীষাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে মনীষা মুক্তি পেলেও রাজীবের বিরুদ্ধে মামলা চলতে থাকে।
তদন্তে উঠে আসে, রাজীব কুমারের সঙ্গে শিল্পার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাজীবের স্ত্রী রাঁচিতে গেলে শিল্পা বেনাচিতির ওই ফ্ল্যাটে যান। পরে আর বাড়ি ফেরেননি। তদন্ত চলাকালীন রাজীব দাবি করেন, শিল্পা তাঁকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তাই তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করেন তিনি। খুনের পর দেহ প্রথমে একটি পরিত্যক্ত ফ্রিজের ভিতরে লুকিয়ে রাখেন। পরে একটি বড় ট্রলি ব্যাগ কিনে তার ভিতরে দেহ ভরে বহুতলের লিফ্টের পাশের ছোট ঘরে ফেলে রাখেন।
মামলার শুনানিতে ২০ জন সাক্ষ্য দেন। ফরেন্সিক রিপোর্ট, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্যপ্রমাণ এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য বিচার করে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক (দ্বিতীয়) প্রশান্ত চৌধুরী সোমবার রাজীব কুমারকে দোষী সাব্যস্ত করেন। মঙ্গলবার বিচারক তাঁকে খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং দেহ লোপাটের চেষ্টার জন্য ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দেন। সরকারি আইনজীবী দেবব্রত সাঁই জানান, দুটি সাজাই একসঙ্গে কার্যকর হবে।
তবে আদালতের এই রায়ে সন্তুষ্ট নয় শিল্পার পরিবার। প্রতিবন্ধী দাদা সন্দীপ আগরওয়াল বলেন, “বোনের মৃত্যুর পর আমাদের পরিবার ভেঙে পড়েছে। বাবা আগেই মারা গিয়েছিলেন। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল শিল্পা। ওর মৃত্যুর পর আমরা কার্যত অসহায় হয়ে গেছি। ব্যাঙ্কে বোনের চাকরিটা চেয়েছিলাম, কিন্তু কোনও সাহায্য পাইনি। আমরা রাজীবের ফাঁসি চাই।”
দুর্গাপুরে ডিএসপি-র ১১ কেভি লাইনে কাজের মাঝেই মর্মান্তিক মৃত্যু কর্মীর
শিল্পার মামা অনিল কেডিয়ার কথাতেও ফুটে ওঠে একই যন্ত্রণা। তাঁর প্রশ্ন, “জেলে থাকলেও পরিবারের লোকজন ওর সঙ্গে দেখা করতে পারবে। কিন্তু আমাদের পরিবারের যে মানুষটা চলে গেল, সে তো আর কোনওদিন ফিরবে না। তাই আমরা আরও কঠোর শাস্তি চেয়েছিলাম।”

