WhatsApp Group Join Now
Instagram Group Join Now

পশ্চিম বর্ধমান শুধু শিল্পাঞ্চল হিসেবেই পরিচিত নয়, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, অরণ্য, নদী, পাহাড় ও লোকসংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয়ও লুকিয়ে রয়েছে এই জেলার নানা প্রান্তে। দুর্গাপুর ও আসানসোলের আশপাশে এমন বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যেখানে একইসঙ্গে মিলবে প্রাচীন ইতিহাস, মন্দির, জঙ্গল, জলাধার এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির স্বাদ। গড় জঙ্গল, মাইথন, ভিড়িঙ্গী শ্মশানকালী মন্দির এবং ঘাঘর বুড়ি মন্দির তারই উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

গড় জঙ্গল: ইতিহাস, অরণ্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

দুর্গাপুরের কাছেই অবস্থিত গড় জঙ্গল, যা মেধাশ্রম নামেও পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। ভাগবত ও অন্যান্য পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, মহামুনি মেধাসের পরামর্শে রাজা সুরাট এই অরণ্যভূমিতে দুর্গাপুজোর প্রথা চালু করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। রাজা সুরাটের মন্দিরে পরবর্তীকালে যোগীরাজ গিরি পুনরায় পুজো শুরু করেন।

গড় জঙ্গলে রয়েছে প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো টেরাকোটা সমৃদ্ধ মন্দির। কথিত আছে, অতীতে এখানে মোট ১৬টি মন্দির ছিল। বর্তমানে টিকে রয়েছে মাত্র দুটি—শ্যামারূপা মন্দির এবং একটি শিবমন্দির

গড় জঙ্গলের শ্যামারূপা মন্দির

গড় জঙ্গল বা মেধাশ্রমের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ শ্যামারূপা মন্দির। একাদশ শতাব্দীর রাজা সুরাটের দুর্গাপুজোর বেদী এখনও এখানে রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়। মূল মন্দিরটি সময়ের সঙ্গে বিলুপ্ত হলেও পরবর্তীকালে বর্ধমানের রাজপরিবারের তত্ত্বাবধানে বর্তমান মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।

আশ্রমের প্রাচীন তেঁতুল গাছটিও এই দীর্ঘ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।

গড় জঙ্গলে ট্রেকিং ও ইছাই ঘোষের দেউল

প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য গড় জঙ্গলের অন্যতম আকর্ষণ প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রেকিং রুট। অরণ্যের মধ্য দিয়ে এই পথ পর্যটকদের প্রকৃতির কাছাকাছি পৌঁছে দেয়।

জঙ্গলের শেষ প্রান্তে রয়েছে ঐতিহাসিক ইছাই ঘোষের দেউল। ধর্মমঙ্গল কাব্যের অন্যতম পরিচিত চরিত্র ইছাই ঘোষকে এই অঞ্চলের এক স্বাধীন সামন্ত রাজা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তাঁর দুর্ভেদ্য ঘাঁটির পাশে এই দেউল নির্মিত হয়েছিল।

ইছাই ঘোষের দেউলটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI)-এর সংরক্ষণাধীন। দেউলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। রয়েছে পার্ক, কটেজ ও গেস্ট হাউস। বনবিভাগের ডিয়ার পার্কে হরিণ ও ময়ূরও দেখা যায়।

শীতকালে গড় জঙ্গলে পিকনিক

দুর্গাপুর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে লাল মাটির রাস্তা ধরে গড় জঙ্গলে পৌঁছানো যায়। শেষ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। শীতকালে গড় জঙ্গল পিকনিকপ্রেমীদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে ওঠে।

জল, জঙ্গল, প্রাচীন স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাস—সব মিলিয়ে গড় জঙ্গল পশ্চিম বর্ধমানের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।

মাইথন: পাহাড়, জলাধার ও নৌবিহারের অপরূপ ঠিকানা

পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র মাইথন। ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ থেকে এটি প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বরাকর নদীর উপর নির্মিত মাইথন বাঁধ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাইথন বাঁধের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫,৭১২ ফুট (৪,৭৮৯ মিটার) এবং উচ্চতা প্রায় ১৬৫ ফুট (৫০ মিটার)। বিশাল জলাধার, পাহাড় ও সবুজ অরণ্য মিলে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

মাইথন বাঁধের জলাধার ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্র

মাইথন জলাধার প্রায় ৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার অধিকাংশ অংশ ঝাড়খণ্ডে। বাঁধের পাশে পাহাড়ের কোলে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ভূগর্ভস্থ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিদ্যুৎকেন্দ্র।

প্রায় ৮০০ মিটার বিস্তৃত কংক্রিটের বাঁধে ১১টি লক গেট রয়েছে। নদীর জল বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছালে এই গেটগুলির মাধ্যমে জল নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদে ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়।

মাইথনে নৌবিহার ও দ্বীপ ভ্রমণ

মাইথনের অন্যতম বড় আকর্ষণ নৌকাবিহার। জলাধারের নীল জলরাশি, চারপাশের সবুজ পাহাড় এবং ছোট ছোট দ্বীপের দৃশ্য নৌকায় বসে উপভোগ করা যায়।

নৌকায় করে পর্যটকরা চামচ দ্বীপ, আনন্দ দ্বীপ ও সবুজ দ্বীপে যেতে পারেন। জল, পাহাড় ও অরণ্যের মেলবন্ধনে এই দ্বীপগুলির পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম।

আসানসোল বা বরাকর স্টেশন থেকে সড়কপথে মাইথনে পৌঁছানো যায়। ২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে যাত্রা করলে অল্প সময়ের মধ্যেই এই জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

ভিড়িঙ্গী শ্মশানকালী মন্দির: দুর্গাপুরের প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য

দুর্গাপুরের ব্যস্ত বেনাচিতি বাজারের কাছেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ভিড়িঙ্গী শ্মশানকালী মন্দির। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে শান্ত আশ্রমিক পরিবেশ।

মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা ফলক অনুযায়ী, মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫২ সালে। কালীপুজোর সময় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু ভক্ত এখানে আসেন। এছাড়াও নীলষষ্ঠী ও পয়লা বৈশাখের মতো বিশেষ দিনেও মন্দিরে ভক্তদের ভিড় দেখা যায়।

ভিড়িঙ্গী শ্মশানকালী মন্দিরের ইতিহাস

স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, একসময় ভিড়িঙ্গী গ্রাম ছিল জঙ্গলে ঘেরা। গ্রামের কুমোর বাঁধের শ্মশানক্ষেত্রে মানুষ দলবদ্ধভাবে শবদাহ করতেন।

প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি আগে গ্রামের বাসিন্দা অক্ষয়কুমার রায় জঙ্গলের মাঝখানে শ্মশানে তালপাতার ছাউনি দিয়ে একটি কালীমন্দির নির্মাণ করেন এবং সেখানে সাধনা শুরু করেন।

বাংলা ১২৫৯ সালের অগ্রহায়ণ মাসের অমাবস্যায় পঞ্চমুন্ডীর বেদির উপর মাতৃমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে জানা যায়। সেই সময় থেকেই স্থানটি ভিড়িঙ্গী শ্মশান কালী মন্দির নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

মন্দিরে যাত্রীনিবাসও রয়েছে। বাইরের দর্শনার্থীরা চাইলে সেখানে রাতে থাকার সুযোগ পান।

ঘাঘর বুড়ি মন্দির: আসানসোলের লোকসংস্কৃতির প্রাচীন নিদর্শন

আসানসোল শহরের উপকণ্ঠে ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে, নুনিয়া নদীর তীরে অবস্থিত ঘাঘর বুড়ি মন্দির। এটি আসানসোলের অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় স্থান।

মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা কালী। বাংলার লোকাচারে ঘাঘর বুড়ি অন্যতম লৌকিক দেবতা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে তিনি গ্রামবাসীর রক্ষা ও কল্যাণের প্রতীক।

ঘাঘর বুড়ি মন্দিরের ইতিহাস

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ঘাঘর বুড়ি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ১৬২০ সাল। তবে স্থানীয় ইতিহাস ও লোকবিশ্বাস অনুসারে, তারও বহু আগে থেকেই গাছতলায় মা ঘাঘর বুড়ির আরাধনা হয়ে আসছিল।

এই মন্দিরের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—এখানে প্রচলিত অর্থে কোনও মূর্তি নেই। পরিবর্তে তিনটি শীলা দেবীর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং সেগুলিই ভক্তদের কাছে পূজিত হয়।

ঘাঘর বুড়ি চন্ডীমাতার মেলা

প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার মন্দিরে নিয়মিত পুজো হয়। প্রতি বছর ১ মাঘ মন্দিরের সামনের খোলা মাঠে বসে ঘাঘর বুড়ি চন্ডীমাতার মেলা

এই মেলা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, আশপাশের গ্রাম ও শহরের মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্রও।

পশ্চিম বর্ধমানে কীভাবে যাবেন?

পূর্ব বর্ধমান কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে ভালোভাবে যুক্ত। দুর্গাপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। সড়কপথেও কলকাতা-আগ্রা জাতীয় সড়ক ১৯-সহ একাধিক জাতীয় ও রাজ্য সড়ক জেলার বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছে।

বিমানে এলে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অথবা পশ্চিম বর্ধমানের কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দর ব্যবহার করা যায়। এরপর সড়কপথে জেলার বিভিন্ন পর্যটনস্থলে পৌঁছানো সম্ভব।

পশ্চিম বর্ধমানের দর্শনীয় স্থান: ইতিহাস ও প্রকৃতির অনন্য সমন্বয়

পশ্চিম বর্ধমানকে শুধু শিল্পাঞ্চল হিসেবে দেখলে জেলার বৈচিত্র্যের বড় একটি অংশ অদেখাই থেকে যায়। গড় জঙ্গলের প্রাচীন মন্দির ও ইছাই ঘোষের দেউল, মাইথনের বিশাল জলাধার ও পাহাড়, ভিড়িঙ্গী শ্মশানকালী মন্দিরের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং ঘাঘর বুড়ি মন্দিরের লোকসংস্কৃতি—প্রতিটি স্থানই পশ্চিম বর্ধমানের আলাদা পরিচয় বহন করে।

ইতিহাসপ্রেমী, প্রকৃতিপ্রেমী, ধর্মীয় পর্যটক কিংবা পরিবার নিয়ে একদিনের ভ্রমণে বেরোতে চান—সবার জন্যই এই স্থানগুলি হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। বিশেষ করে শীতকালে গড় জঙ্গল ও মাইথনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।

পশ্চিম বর্ধমানের পর্যটন মানচিত্রে তাই এই চারটি স্থান শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, বরং জেলার ইতিহাস, প্রকৃতি, ধর্ম ও লোকঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।

আরও পড়ুন:  পূর্ব বর্ধমানের দর্শনীয় স্থান: ভালকি মাচান থেকে কালনা, এক জেলায় ইতিহাস-প্রকৃতি-ঐতিহ্যের ১৫ সেরা ঠিকানা