
কেন ঘুরবেন পূর্ব বর্ধমানে?
নিজস্ব প্রতিবেদন, দুর্গাপুর দর্পণ: পূর্ব বর্ধমান মানেই শুধু বর্ধমান শহর নয়। ইতিহাস, রাজপরিবারের স্মৃতি, প্রাচীন মন্দির, বাংলার টেরাকোটা স্থাপত্য, জঙ্গল, জলাভূমি, পরিযায়ী পাখি এবং আধুনিক স্থাপত্য—সব মিলিয়ে পূর্ব বর্ধমানের পর্যটন মানচিত্র যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়।
কলকাতা, দুর্গাপুর, আসানসোল-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় জেলার একাধিক দর্শনীয় স্থানে। ফলে একদিনের ভ্রমণ, সপ্তাহান্তের ছোট ট্যুর কিংবা পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য পূর্ব বর্ধমানের পর্যটন কেন্দ্রগুলি বেশ আকর্ষণীয়।
পূর্ব বর্ধমানে কোথায় ঘুরবেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তালিকায় উঠে আসে আউশগ্রামের রহস্যময় ভালকি মাচান, পূর্বস্থলীর পাখির স্বর্গ চুপি চর, বর্ধমান শহরের কার্জন গেট, সর্বমঙ্গলা মন্দির, শের আফগানের সমাধি, কঙ্কালেশ্বরী কালী মন্দির, কৃষ্ণসায়র, গোলাপবাগ, রমনাবাগান এবং কালনার ঐতিহাসিক রাজবাড়ি মন্দির চত্বর।
পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকাতেও এই জেলার একাধিক ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক গন্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার দর্শনীয় স্থানগুলি সড়কপথে ভালোভাবে সংযুক্ত এবং বর্ধমান জংশনও গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগের কেন্দ্র।
তাহলে চলুন, দেখে নেওয়া যাক পূর্ব বর্ধমানের ১৫টি দর্শনীয় স্থান, যেখানে ইতিহাস, প্রকৃতি, ধর্ম ও স্থাপত্য একসঙ্গে মিশে রয়েছে।
১. ভালকি মাচান: পূর্ব বর্ধমানের জঙ্গল, ইতিহাস ও রহস্যের ঠিকানা
আউশগ্রাম অঞ্চলের ভালকি মাচান প্রকৃতি, ইতিহাস ও লোককথার এক আকর্ষণীয় মেলবন্ধন। ভালকি গ্রাম থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে প্রতাপপুর বনাঞ্চলের পথে অবস্থিত এই জায়গাটি ঘন সবুজে ঘেরা নির্জন পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকাতেও ভালকি মাচানের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পুরনো কাঠামোর উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বর্ধমানের রাজারা একসময় এই জঙ্গলে ভালুক শিকারে আসতেন। জঙ্গলের মধ্যে উঁচু মাচা তৈরি করে শিকার করার প্রচলন থেকেই ‘ভালকি মাচান’ নামটির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।
এই এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ইটের কাঠামো ও ধ্বংসাবশেষ। তার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি পুরনো টাওয়ার। স্থানীয়ভাবে অনেকে এটিকে ওয়াচ টাওয়ার মনে করলেও, এর সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক Great Trigonometrical Survey (GTS)-এর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়। ফলে জায়গাটি শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নয়, ইতিহাস ও বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছেও আকর্ষণীয়।
জঙ্গলের নির্জনতা, পুরনো স্থাপত্য, জলাশয় এবং আশপাশের সবুজ পরিবেশ মিলিয়ে ভালকি মাচান আজ পূর্ব বর্ধমানের অন্যতম অফবিট পর্যটন কেন্দ্র। শীতকালে পিকনিক ও প্রকৃতি উপভোগের জন্যও জায়গাটি জনপ্রিয়।
২. অট্টহাস সতী পীঠ: পূর্ব বর্ধমানের প্রাচীন শক্তিপীঠ ও দর্শনীয় স্থান
কাটোয়া মহকুমার কেতুগ্রাম এলাকার দক্ষিণডিহিতে অবস্থিত অট্টহাস সতী পীঠ পূর্ব বর্ধমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র। ঘন সবুজের মধ্যে মন্দিরের অবস্থান এবং পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঈশাণী নদী এই জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিবেশ।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি একটি সতীপীঠ। প্রচলিত বিশ্বাসে বলা হয়, এখানে দেবী সতীর অধর বা নিচের ঠোঁট পতিত হয়েছিল। ফলে সারা বছরই ভক্তদের আনাগোনা থাকে।
স্থানীয় লোককথায় রয়েছে এক সাধুবাবার কথা, যিনি একসময় জঙ্গলের মধ্যে সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। তাঁর যজ্ঞ এবং ত্রিশূল স্থাপনের সঙ্গে এই পীঠের ইতিহাসের একটি লোকবিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে।
শীতকালে এই অঞ্চল আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। পরিযায়ী পাখির উপস্থিতিও দেখা যায়। দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে এখানে মেলার আয়োজন হয়। ফলে ধর্মীয় দর্শনের পাশাপাশি প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতেও এখানে আসেন বহু মানুষ। জেলা প্রশাসনও অট্টহাসকে বনঘেরা ধর্মীয় ও পাখিপ্রেমীদের আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
৩. পূর্বস্থলী চুপি চর: পূর্বস্থলীর পাখির স্বর্গ ও পরিযায়ী পাখির ঠিকানা
পূর্বস্থলী চুপি চর পূর্ব বর্ধমানের অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র। কালনার পূর্বস্থলীর কাছে অবস্থিত এই জায়গাটি মূলত একটি অক্সবো লেক বা অশ্বক্ষুরাকৃতি জলাভূমি, যা স্থানীয়ভাবে চুপি চর নামে পরিচিত।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই জলাভূমির জলপথ প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং আশপাশের ফলের বাগান ও জলাভূমি ৭০টিরও বেশি স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখিকে আকর্ষণ করে।
শীত এলেই পাখিপ্রেমীদের ভিড় বাড়ে। বিভিন্ন জলচর ও পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে এই অঞ্চলে। নৌকায় জলাভূমির মধ্যে ঘুরে পাখি দেখার অভিজ্ঞতাও পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ।
তবে চুপি চরকে শুধু পিকনিক স্পট হিসেবে না দেখে প্রকৃতি ও পাখির আবাসস্থল হিসেবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত শব্দ, প্লাস্টিক ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এই ধরনের জলাভূমির পরিবেশের উপর চাপ তৈরি করতে পারে।
৪. কার্জন গেট বা বিজয় তোরণ: বর্ধমানের ঐতিহাসিক স্থাপত্য

বর্ধমান শহরের জিটি রোড ও বিসি রোডের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা কার্জন গেট বা বিজয় তোরণ শহরের অন্যতম পরিচিত প্রতীক।
১৯০৩ সালে বর্ধমানের মহারাজা বিজয় চাঁদ মহতাবের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে এই তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। পরের বছর, ১৯০৪ সালে তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন বর্ধমান সফরে এলে তাঁর সম্মানে তোরণটির নাম হয় ‘কার্জন গেট’। স্বাধীনতার পরে এর নামকরণ করা হয় ‘বিজয় তোরণ’।
তোরণের স্থাপত্যে ইউরোপীয় প্রভাব স্পষ্ট। বিশাল খিলান, স্তম্ভ এবং উপরের ভাস্কর্যগুলি এই স্থাপনাকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
আজ বর্ধমানের কার্জন গেট শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি শহরের পরিচয়ের অন্যতম অংশ এবং পর্যটকদের কাছে ছবি তোলার জনপ্রিয় জায়গা।
৫. শের আফগানের সমাধি: নূরজাহানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বর্ধমানের ইতিহাস
বর্ধমান রাজবাড়ির কাছাকাছি পীর বাহারম এলাকায় অবস্থিত শের আফগানের সমাধি মুঘল যুগের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন।
শের আফগান ছিলেন মুঘল আমলের এক সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেসাই পরবর্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিবাহের পর ইতিহাসে নূরজাহান নামে পরিচিত হন।
১৬১০ সালে বর্ধমান রেলওয়ে স্টেশনের কাছে শের আফগান ও কুতুবউদ্দীন খান কোকা-র মধ্যে সংঘর্ষে দু’জনেরই মৃত্যু হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের সমাধি পাশাপাশি অবস্থান করছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই সমাধিগুলি বর্ধমান রাজ পরিবারের উদ্যোগে নির্মিত এবং বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা ASI-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
তাই ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বর্ধমানের শের আফগানের সমাধি একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান।
৬. সর্বমঙ্গলা মন্দির: বর্ধমানের প্রাচীন নবরত্ন মন্দির

বর্ধমান শহরের ডি.এন. সরকার রোডে অবস্থিত সর্বমঙ্গলা মন্দির জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা।
১৭০২ সালে মহারাজা কীর্তিচাঁদ এই মন্দির নির্মাণ করেন। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দেবী সর্বমঙ্গলার বিগ্রহটি প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো বলে মনে করা হয় এবং মন্দিরটি অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির হিসেবে পরিচিত।
মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা লোককথা। একটি প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একটি পাথরের মূর্তি উদ্ধার হওয়ার পর সেটিকে দেবী সর্বমঙ্গলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মন্দিরের টেরাকোটা অলংকরণ, প্রাচীন স্থাপত্য এবং সংলগ্ন বিভিন্ন শিবমন্দির এই স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
৭. নবাবহাটের ১০৮ শিবমন্দির: নবাবহাট ও কালনার অনন্য শিবমন্দির স্থাপত্য
বর্ধমান শহরের সিউড়ি রোডের কাছে নবাবহাট এলাকায় রয়েছে ১০৮ শিবমন্দির। ১৭৮৮ সালে মহারাণী বিষ্ণান কুমারীর উদ্যোগে নির্মিত এই মন্দিরসমূহ আয়তাকার বিন্যাসে সাজানো। জেলা প্রশাসনের তথ্যেও ১০৮টি মন্দিরের এই আয়তাকার বিন্যাসের উল্লেখ রয়েছে। একসঙ্গে এতগুলি শিবমন্দিরের এমন পরিকল্পিত বিন্যাস এই স্থাপনাকে আলাদা করে তুলেছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী মন্দির স্থাপত্যের প্রভাব এখানে স্পষ্ট। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি স্থাপত্য ও ইতিহাসের কারণে নবাবহাট ১০৮ শিবমন্দির বর্ধমানের দর্শনীয় স্থানগুলির তালিকায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
অন্যদিকে কালনার ১০৮ শিবমন্দির সম্পূর্ণ ভিন্ন নকশায় নির্মিত—এখানে মন্দিরগুলি বৃত্তাকারভাবে সাজানো, যা দর্শকদের কাছে এক অনন্য স্থাপত্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এই মন্দিরসমূহ নির্মাণ করেন বর্ধমানের রাজা তেজচন্দ্র, ১৮০৯ সালে। শোনা যায়, রাজপরিবারের সম্পত্তি স্থানান্তর এবং মালিকানা উদ্যাপন উপলক্ষে এই মন্দির গড়ে তোলা হয়েছিল।
দুটি ক্ষেত্রেই বাংলার ঐতিহ্যবাহী আটচালা স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। সরলতা ও সৌন্দর্যের মিশেলে গড়ে ওঠা এই মন্দিরগুলি শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, স্থাপত্য ও ইতিহাসের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
৮. খাজা আনোয়ার বেড় বা নবাব বাড়ি: বর্ধমানের মুঘল স্থাপত্যের স্মৃতি
বর্ধমান শহরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত খাজা আনোয়ার বেড়, স্থানীয়ভাবে ‘নবাব বাড়ি’ নামে পরিচিত। প্রায় তিনশো বছরের পুরনো এই স্থাপত্যে মুঘল আমলের ইতিহাস ও স্থাপত্যের ছাপ দেখা যায়।
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, মুঘল আমলে বর্ধমান অঞ্চলে সংঘটিত এক যুদ্ধে খাজা সৈয়দ আনোয়ার ও খাজা আবুল কাসেম নিহত হন। তাঁদের স্মৃতিকে ঘিরে পরবর্তীকালে এই স্থাপত্য গড়ে ওঠে।
উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত প্রাঙ্গণ, পুকুর এবং স্থাপত্যের নকশায় ইন্দো-সিরীয় প্রভাব এই জায়গাটির অন্যতম আকর্ষণ। জেলা প্রশাসনও এটিকে প্রায় তিনশো বছরের পুরনো স্থাপত্য এবং ইন্দো-সিরীয় স্থাপত্যের মিশ্রণের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
৯. বর্ধমান টাউন হল: শহরের ঐতিহ্যের এক পুরনো সাক্ষী
বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের তালিকায় টাউন হল একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৮৯০ থেকে ১৮৯৪ সালের মধ্যে নির্মিত এই ভবন দীর্ঘদিন ধরে শহরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।
লালা বংশগোপাল নান্ডের স্মৃতির সঙ্গে এই ভবনের নির্মাণের সম্পর্ক রয়েছে। পরবর্তীকালে বর্ধমান পুরসভার উদ্যোগে এর সংস্কারও করা হয়। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে টাউন হলটির পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল।
পুরনো ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের ছাপ, প্রশস্ত বারান্দা ও ঐতিহাসিক পরিবেশের কারণে বর্ধমানের ইতিহাস জানতে আগ্রহী পর্যটকদের কাছে জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ।
১০. কঙ্কালেশ্বরী কালী মন্দির: বর্ধমানের রহস্যময় কালীমন্দির
বর্ধমান শহরের কাঞ্চননগরে অবস্থিত কঙ্কালেশ্বরী কালী মন্দির তার ব্যতিক্রমী বিগ্রহের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
দামোদর নদ-সংলগ্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া এই কালীমূর্তির গঠন মানব কঙ্কালের মতো। অখণ্ড পাথর খোদাই করে তৈরি বিগ্রহে শরীরের শিরা-উপশিরার সূক্ষ্ম খোদাই দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
দেবীর অষ্টভূজা রূপ, নরমুণ্ডমালা এবং শিবের উপস্থিতি মূর্তিটির ধর্মীয় ও শিল্পমূল্য বাড়িয়েছে। মন্দিরটির নয়টি চূড়া থাকায় এটিকে নবরত্ন মন্দিরও বলা হয়। জেলা প্রশাসনের বর্তমান তথ্যেও কঙ্কালেশ্বরী মন্দিরকে পূর্ব বর্ধমানের নবরত্ন মন্দিরগুলির অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১১. রমনাবাগান ইকো পার্ক: বর্ধমানের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর ঠিকানা

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাপবাগ ক্যাম্পাসের কাছে প্রায় ১৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে রয়েছে রমনাবাগান জুলজিক্যাল পার্ক। হরিণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এই পার্কে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ও পাখি রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে চিতাবাঘ, ভাল্লুক, কুমির, চিতল হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে এবং এটি বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে গেলে এটি বিশেষ আকর্ষণীয়। শিশুদের কাছে প্রাণীদের কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা যেমন শিক্ষামূলক, তেমনই প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর সুযোগও তৈরি করে।
ফলে বর্ধমানে পরিবার নিয়ে কোথায় ঘুরবেন—এই প্রশ্নের উত্তরে রমনাবাগান অবশ্যই রাখা যায়।
১২. চাঁদনী পার্কের জলটুঙ্গি: আউশগ্রামের ঐতিহাসিক জলমহল
আউশগ্রামের দিগনগর গ্রামের চাঁদনী পার্কের জলটুঙ্গি একটি ছোট জলাশয়ের মাঝখানে তৈরি ঐতিহাসিক স্থাপনা।
প্রায় ১৭১০ সালের দিকে মহারাজা কীর্তিচাঁদের উদ্যোগে এটি নির্মিত হয়েছিল বলে জেলা প্রশাসনের তথ্য জানায়। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রশাসনের উদ্যোগে জায়গাটির পুনরুদ্ধার করা হয় এবং সন্ধ্যায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো চালু করা হয়।
জলাশয়ের মাঝখানে স্থাপত্য, চারপাশের সবুজ এবং সন্ধ্যার আলোকসজ্জা—সব মিলিয়ে জায়গাটি তৈরি করে আলাদা পরিবেশ। প্রকৃতি ও ইতিহাস একসঙ্গে দেখতে চাইলে জলটুঙ্গি, চাঁদনী পার্ক হতে পারে একটি ভালো গন্তব্য।
১৩. কৃষ্ণসায়র ইকোলজিক্যাল পার্ক: বর্ধমান শহরের সবুজ-জলাশয়ের ঠিকানা
বর্ধমান শহরের অন্যতম জনপ্রিয় প্রাকৃতিক গন্তব্য কৃষ্ণসায়র ইকোলজিক্যাল পার্ক। এর কেন্দ্রে রয়েছে বিশাল জলাশয়, চারপাশে গাছপালা ও হাঁটার জায়গা।
ঐতিহাসিকভাবে এই জলাশয়ের সঙ্গে বর্ধমান রাজপরিবারের সম্পর্ক রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬৯১ সালে প্রায় ৩৩ একর জমির উপর একটি বিশাল কৃত্রিম হ্রদ নির্মাণ করা হয়েছিল।
আজকের কৃষ্ণসায়র শহরের ব্যস্ততার মধ্যে শান্ত সময় কাটানোর জায়গা। হ্রদের ধারে বসে সময় কাটানো, হাঁটাহাঁটি কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ—সবকিছুর জন্যই এটি জনপ্রিয়।
বর্ধমানে একদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা করলে কৃষ্ণসায়রকে সহজেই তালিকায় রাখা যায়।
১৪. গোলাপবাগ: বর্ধমানের ঐতিহাসিক উদ্যান ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
বর্ধমানের গোলাপবাগ শুধু একটি উদ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজপরিবার, উদ্ভিদবিদ্যা এবং শিক্ষার ইতিহাস।
রাজা বিজয় চাঁদ মহতাবের উদ্যোগে উনিশ শতকের শেষভাগে এই বাগান গড়ে ওঠে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গোলাপবাগে বোটানিক্যাল ও জুলজিক্যাল গার্ডেনের ঐতিহ্য রয়েছে এবং বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী ডালটন হুকার এখানে ১২৮ ধরনের গাছ তালিকাভুক্ত করেছিলেন। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাপবাগ ক্যাম্পাসও এই ঐতিহাসিক এলাকার অংশ।
সবুজে ঘেরা এই পরিবেশ শিক্ষার্থী, প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে সমান আকর্ষণীয়।
১৫. কালনা রাজবাড়ি মন্দির: টেরাকোটা স্থাপত্যের অসাধারণ ভাণ্ডার
অম্বিকা কালনা পূর্ব বর্ধমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শহর। ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই শহর একসময় সমৃদ্ধ বন্দরনগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে বর্ধমান রাজপরিবারের উদ্যোগে এখানে একের পর এক মন্দির নির্মিত হয়।
আজ কালনা রাজবাড়ি মন্দির চত্বর বাংলার টেরাকোটা স্থাপত্যের অন্যতম আকর্ষণীয় নিদর্শন। জেলা প্রশাসন কালনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ temple town হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং জানিয়েছে, এখানে বাংলার টেরাকোটা স্থাপত্যের বেশ কিছু উৎকৃষ্ট নিদর্শন রয়েছে।
এই মন্দিরচত্বরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ১০৮ শিবমন্দির। নবাবহাটের ১০৮ শিবমন্দিরের মতো এখানে মন্দিরগুলি আয়তাকার নয়; কালনায় ১০৮টি মন্দির দুটি বৃত্তাকার বিন্যাসে সাজানো। এই ব্যতিক্রমী স্থাপত্য পরিকল্পনাই কালনার ১০৮ শিবমন্দিরকে বিশেষ করে তুলেছে।
কালনা রাজবাড়ি মন্দির চত্বরে রয়েছে আরও একাধিক ঐতিহাসিক মন্দির ও টেরাকোটা স্থাপত্য। তাই কালনা ভ্রমণ শুধুমাত্র ধর্মীয় পর্যটন নয়—এটি বাংলার ইতিহাস, স্থাপত্য ও শিল্পকলাকে কাছ থেকে দেখার একটি অসাধারণ সুযোগ। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের বিভিন্ন ভ্রমণ পরিকল্পনাতেও কালনার রাজবাড়ি মন্দির চত্বর ও ১০৮ শিবমন্দিরকে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পূর্ব বর্ধমানে কীভাবে যাবেন?
পূর্ব বর্ধমান কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে ভালোভাবে যুক্ত। বর্ধমান জংশন জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। সড়কপথেও কলকাতা-আগ্রা জাতীয় সড়ক ১৯-সহ একাধিক জাতীয় ও রাজ্য সড়ক জেলার বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছে।
বিমানে এলে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অথবা পশ্চিম বর্ধমানের কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দর ব্যবহার করা যায়। এরপর সড়কপথে জেলার বিভিন্ন পর্যটনস্থলে পৌঁছানো সম্ভব।
একদিনে কোথায় ঘুরবেন?
সময় কম থাকলে বর্ধমান শহরকেন্দ্রিক একটি ছোট ট্যুর করা যায়। যেমন—কার্জন গেট → সর্বমঙ্গলা মন্দির → শের আফগানের সমাধি → গোলাপবাগ → রমনাবাগান → কৃষ্ণসায়র।
অন্যদিকে প্রকৃতি ও পাখি দেখতে চাইলে পূর্বস্থলী–চুপি চর আলাদা দিনের জন্য রাখা ভালো। আর ইতিহাস ও মন্দির স্থাপত্যে আগ্রহ থাকলে কালনা রাজবাড়ি মন্দির চত্বর ও ১০৮ শিবমন্দির নিয়ে একদিনের পরিকল্পনা করা যায়।
জঙ্গল, প্রকৃতি ও অফবিট অভিজ্ঞতার জন্য ভালকি মাচান এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশের জন্য অট্টহাস সতী পীঠ বেছে নেওয়া যেতে পারে।
কেন ঘুরবেন পূর্ব বর্ধমানে?
পূর্ব বর্ধমানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এর বৈচিত্র্য। একই জেলার মধ্যে দেখা যায় রাজপরিবারের ইতিহাস, মুঘল যুগের স্মৃতি, প্রাচীন নবরত্ন মন্দির, টেরাকোটা স্থাপত্য, ১০৮ শিবমন্দির, জঙ্গল, জলাভূমি, পরিযায়ী পাখি, বন্যপ্রাণী এবং আধুনিক স্থাপত্য।
তাই পূর্ব বর্ধমানের দর্শনীয় স্থান শুধু একটি তালিকা নয়—এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও স্থাপত্যকে একসঙ্গে জানার একটি সুযোগ।
উইকএন্ডে নতুন কোনও গন্তব্য খুঁজছেন? তাহলে কলকাতা বা দুর্গাপুর থেকে খুব বেশি দূরে না গিয়েও একদিন বা দু’দিনের পরিকল্পনায় ঘুরে দেখা যেতে পারে পূর্ব বর্ধমানের এই ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রকৃতির ঠিকানাগুলি।


