
দুর্গাপুর দর্পণ, মঙ্গলকোট, ১২ আগস্ট: জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় ভুগছেন মঙ্গলকোটের এক জমি মালিক। দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি এবং প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় এবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মঙ্গলকোটের বাসিন্দা মোল্লা জসিমউদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, একদিকে সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচারক না থাকায় মামলা এগোচ্ছে না, অন্যদিকে জেলা ভূমি অধিগ্রহণ দপ্তরে লিখিত আপত্তি ও জমির নকশা জমা দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হয়নি।
জানা গিয়েছে, মঙ্গলকোট মৌজার জে.এল. নম্বর ৬৪, খতিয়ান নম্বর ১১১৩১ এবং দাগ নম্বর ৩১০১-এর জমি জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট জসিমউদ্দিন ১৯৫৬ সালের জাতীয় ভূমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী L.A. Case No. 49 (NH-116A) 22-23 সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নোটিশ পান।
তাঁর দাবি, মোট ৩০ শতক জমি অধিগ্রহণের আওতায় পড়লেও নোটিশে আর্থিক ক্ষতিপূরণ উল্লেখ করা হয়েছিল মাত্র ১৫ শতকের জন্য। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান তিনি। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট মঙ্গলকোট গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে ভূমি দপ্তরের শুনানিতে নিজের আপত্তির কথা জানানোর পাশাপাশি পরদিন, ২৬ আগস্ট, পূর্ব বর্ধমান জেলা ভূমি দপ্তরের বিশেষ জমি অধিগ্রহণ আধিকারিকের কাছে স্কেচ ম্যাপ-সহ লিখিত আপত্তিও জমা দেন।
এরপর চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি ভূমি দপ্তরের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দাগের জমির মালিকদের নোটিশ দিয়ে ৮ জানুয়ারি জমি পরিদর্শনের কথা জানানো হয়। নির্ধারিত দিনে জসিমউদ্দিনও সরেজমিন তদন্তে অংশ নেন। তাঁর বক্তব্য, তদন্তের সময় তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, বাস্তবে যেহেতু পুরো ৩০ শতক জমিই অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তাই সেই অনুযায়ী সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
কিন্তু এর মধ্যেই সময় গড়াতে থাকে। জমি অধিগ্রহণের কারণে একাধিকবার জমিতে ধান চাষ করতে পারেননি বলে দাবি জসিমউদ্দিনের। পাশাপাশি, প্রায় এক বছর ধরে অধিগৃহীত জমির জন্য বরাদ্দ ক্ষতিপূরণের অর্থও হাতে না পাওয়ায় তাঁর পরিবার আর্থিক সমস্যার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জেলা ভূমি দপ্তর সংশ্লিষ্ট দাগের জমির মালিকদের সামগ্রিক ক্ষতিপূরণের চেক পূর্ব বর্ধমান জেলা ও দায়রা বিচারকের দপ্তরে পাঠায়। মেমো নম্বর ৩৬৩। পরবর্তীতে বিষয়টি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক (দ্বিতীয়)-এর এজলাসে L.A. Case No. 4/26 হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
কিন্তু সেখানেও তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা। জসিমউদ্দিনের দাবি, প্রায় ছয় মাস কেটে গেলেও মামলার তেমন অগ্রগতি হয়নি। কারণ সংশ্লিষ্ট এজলাসে বিচারকের পদ বর্তমানে শূন্য। ফলে ক্ষতিপূরণের আশায় থাকা জমি মালিকদের অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত বিচারক নিয়োগ করে মামলাটির শুনানি শুরু করার আবেদন জানিয়েছেন জসিমউদ্দিন। গত ৭ আগস্ট ই-মেইলের মাধ্যমে এবং ১০ আগস্ট কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির সচিবালয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে বিষয়টি নজরে এনেছেন তিনি।
শুধু আদালতের বিষয়েই নয়, জেলা ভূমি অধিগ্রহণ দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই জমি মালিক। তাঁর অভিযোগ, স্কেচ ম্যাপ-সহ লিখিত আপত্তি জানানোর পরও দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর পদক্ষেপ হয়নি। এমনকী দপ্তরের আধিকারিকরা সরেজমিনে আমিন দিয়ে জমি মাপার পরও সমস্যার দ্রুত সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর দাবি।
আরও পড়ুন: সিন্ডিকেট করলে চামড়া তুলে নেব! দুর্গাপুরে কড়া হুঁশিয়ারি পুলিশের
দুর্গাপুরে বিশেষ ভাবে সক্ষম স্কুলছাত্রকে নির্যাতনের অভিযোগ পুলকার চালকদের বিরুদ্ধে
জসিমউদ্দিনের বক্তব্য, জমি অধিগ্রহণের পর চাষের সুযোগ হারিয়েছেন, আবার প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের অর্থও সময়মতো হাতে পাননি। তার উপর আদালতে মামলা চললেও বিচারক না থাকায় শুনানি কার্যত থমকে রয়েছে। ফলে একজন সাধারণ জমি মালিককে নিজের ন্যায্য পাওনা পেতে বারবার প্রশাসনিক দপ্তর ও আদালতের দরজায় ঘুরতে হচ্ছে।
মামলার পাহাড় কমাতে যখন আদালতের তরফে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তখন বিচারক পদ শূন্য থাকা এবং প্রশাসনিক স্তরে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেন আরও বাড়ছে—এমনই অভিযোগ মঙ্গলকোটের এই জমি মালিকের। (বিশেষ বিশেষ খবরের ভিডিয়ো দেখতে Durgapur Darpan Youtube Channel সাবস্ক্রাইব করুন)

